গুজব প্রতিরোধে ডিজিটাল নাগরিক
jagonews24.com
Sunday, February 1, 2026

ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে আমাদের জীবন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সমাজে এক নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে তা হচ্ছে গুজব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন যে কোনো তথ্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এই গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। ফল...
ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারে আমাদের জীবন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সমাজে এক নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে তা হচ্ছে গুজব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন যে কোনো তথ্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এই গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। ফলে গুজব আর নিছক ভুল তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সামাজিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় গুজব প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো সচেতন ডিজিটাল নাগরিক।
গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের অসচেতনতা ও আবেগপ্রবণতা। কোনো তথ্য চমকপ্রদ, ভয়াবহ বা আবেগী হলে আমরা যাচাই না করেই তা শেয়ার করে দিই। অনেক সময় মনে হয়, আমি তো শুধু শেয়ার করলাম, ক্ষতি কী? কিন্তু বাস্তবে এই একটি শেয়ারই গুজবকে বহুগুণ শক্তিশালী করে তোলে। তাই ডিজিটাল নাগরিকত্ব মানে কেবল ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানা সেটা নয় বরং দায়িত্বশীল আচরণ, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস এবং অনলাইন নৈতিকতা চর্চা করা।
একজন দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক জানেন, সব খবর বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি তথ্যের উৎস খোঁজেন, মূল সংবাদমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে মিলিয়ে দেখেন এবং সন্দেহজনক হলে শেয়ার থেকে বিরত থাকেন। ছবি বা ভিডিও দেখলেই তিনি ধরে নেন না যে সেটি সত্য; বরং প্রেক্ষাপট, সময় ও স্থান যাচাই করেন। এই সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিই গুজব প্রতিরোধের প্রথম প্রতিরক্ষা।
গুজবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সামাজিক সম্প্রীতির ওপর। ধর্ম, রাজনীতি বা জাতিগত পরিচয়কে ঘিরে ছড়ানো ভুয়া তথ্য মুহূর্তেই উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, একটি মিথ্যা পোস্ট বা বিকৃত স্ক্রিনশট থেকে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে গুজব প্রতিরোধ কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ব।
শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল ও মিডিয়া লিটারেসিকে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে ভুয়া খবর শনাক্ত করতে হয়, কীভাবে ফ্যাক্ট-চেকিং টুল ব্যবহার করা যায় এবং কেন অনলাইনে নৈতিক আচরণ জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারে অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা: কী শেয়ার করা উচিত, কী নয় এবং কেন নয়। সচেতনতা যদি ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হয়ে উঠবে।
রাষ্ট্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও অপসারণে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, গুজববিরোধী উদ্যোগ যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব না করে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান।
গুজব শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসের সংকট তৈরি করে। যখন মানুষ বারবার ভুয়া তথ্যের মুখোমুখি হয়, তখন সত্যকেও সন্দেহের চোখে দেখে। এই অবস্থা গণতন্ত্র, সামাজিক ঐক্য ও উন্নয়নের পথে বড় বাধা। তাই গুজব প্রতিরোধ মানে সত্যকে রক্ষা করা, সমাজের আস্থা টিকিয়ে রাখা।
গুজব প্রতিরোধে ডিজিটাল সিটিজেন হিসেবে ফ্যাক্ট চেকিং করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ অভূতপূর্ব। এক ক্লিকেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে লাখো মানুষের কাছে, মুহূর্তে তৈরি হচ্ছে মতামত, ক্ষোভ কিংবা উচ্ছ্বাস। কিন্তু এই গতিময় তথ্যবিপ্লবের উল্টো পিঠে আছে এক গভীর সংকট ও ভুয়া তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ শুধু মতপ্রকাশের জায়গায় না থেকে হয়ে উঠেছে বিভ্রান্তি ছড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমও। এই বাস্তবতায় গুজব প্রতিরোধ কেবল রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব পেরিয়ে প্রত্যেক সচেতন ডিজিটাল সিটিজেন-এরেও নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব বর্তায়। আর এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো ফ্যাক্ট চেকিং বা সত্যতা যাচাই করা।
ডিজিটাল যুগে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা বদলে গেছে। এখন নাগরিক মানে শুধু রাষ্ট্রের আইন মানা নয়, অনলাইন পরিসরেও দায়িত্বশীল আচরণ করা। একজন সচেতন ডিজিটাল সিটিজেন জানেন যাচাই ছাড়া শেয়ার করা মানেই গুজবের অংশ হয়ে যাওয়া। আর একজন দায়িত্বশীল নাগরিক জানেন, সত্য যাচাই করা কেবল অধিকার নয়, দায়িত্বও।
গুজব সাধারণত সত্যের মুখোশ পরে আসে। আবেগী ভাষা, ভয়াবহ শিরোনাম, ধর্মীয় অনুভূতি, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক উত্তেজনাকে পুঁজি করে মিথ্যাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়। অনেক সময় পুরোনো ছবি বা ভিডিও নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, কখনো কাটা ক্লিপ দিয়ে পুরো বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়। আমরা যখন যাচাই না করে এসব তথ্য শেয়ার করি, তখন অজান্তেই গুজবের শৃঙ্খলে যুক্ত হয়ে পড়ি। বাস্তবে গুজবের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো অদৃশ্য চক্র নয়; বরং আমাদের অসচেতন আঙুল।
এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল সিটিজেনশিপ ধারণাটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ডিজিটাল সিটিজেন মানে কেবল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নয়; বরং অনলাইনে দায়িত্বশীল, নৈতিক ও সচেতন নাগরিক। যেমন বাস্তব জীবনে আইন, শালীনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি ডিজিটাল পরিসরেও নাগরিক আচরণের মানদণ্ড থাকা জরুরি। একজন দায়িত্বশীল ডিজিটাল সিটিজেন জানেন, ভুল তথ্য ছড়ানোও সামাজিক ক্ষতি, কখনো কখনো তা সহিংসতা ও প্রাণহানির কারণও হতে পারে।
গুজবের ক্ষতি কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর। ধর্মীয় গুজব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে, রাজনৈতিক ভুয়া তথ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আর নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুজব জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, একটি ফেসবুক পোস্ট বা গুজবনির্ভর স্ক্রিনশট থেকে শুরু হয়েছে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও সহিংসতা। ফলে গুজব প্রতিরোধ মানে কেবল সত্য-মিথ্যার লড়াই নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষারও লড়াই।
এই লড়াইয়ে ফ্যাক্ট চেকিং অপরিহার্য। ফ্যাক্ট চেকিং মানে শুধু সাংবাদিকতা নয়; এটি এখন নাগরিক দক্ষতা। কোনো তথ্য দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার না করে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন করাই ফ্যাক্ট চেকিংয়ের প্রথম ধাপ: তথ্যটির উৎস কী? এটি কি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা অফিসিয়াল সূত্র থেকে এসেছে? একই খবর কি একাধিক বিশ্বস্ত মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে? ছবি বা ভিডিও হলে সেটি কি পুরোনো? এই প্রশ্নগুলো করার অভ্যাসই একজন সাধারণ ব্যবহারকারীকে দায়িত্বশীল ডিজিটাল সিটিজেনে পরিণত করতে পারে।
প্রযুক্তি আমাদের হাতে ফ্যাক্ট চেকিংয়ের নানা সহজ উপায় দিয়েছে। রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে ছবি কোথা থেকে এসেছে তা জানা যায়, ভিডিওর তারিখ ও স্থান যাচাই করা যায়, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা স্বীকৃত গণমাধ্যমে মিলিয়ে দেখা যায়। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা নিয়মিত ভুয়া খবর যাচাই করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা অনেকে কোন কিছু যাচাই করার চেয়ে শেয়ার করতেই বেশি আগ্রহী। কারণ যাচাই সময় নেয়, আর শেয়ার তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দেয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে কোনো প্রযুক্তিই গুজব ঠেকাতে পারবে না।
এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যক্রমে মিডিয়া ও ডিজিটাল লিটারেসি অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে ভুয়া খবর চেনা যায় এবং কেন অনলাইনে নৈতিক আচরণ জরুরি। এটি কেবল আইসিটি বিষয়ক শিক্ষা নয়। এটি নাগরিক ও সামাজিক শিক্ষা। স্কুল-কলেজ থেকেই যদি ‘শেয়ার করার আগে যাচাই’ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বভাবতই গুজব-প্রতিরোধী হয়ে উঠবে।
পরিবারও সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শিশু-কিশোররা আজ খুব অল্প বয়সেই স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে। অভিভাবকদের দায়িত্ব শুধু নজরদারি না করে খাবার টেবিলে বসে হলেও দৈনিক সন্তানদেরকে দিকনির্দেশনা দেওয়া। কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোনটি নয় এই বোধ যদি পরিবার থেকেই তৈরি হয়, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রাষ্ট্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বও হলো ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও অপসারণে স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে ফ্যাক্ট চেকিং উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে। তবে গুজব দমনের নামে যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। আইন প্রয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু আইন একা যথেষ্ট নয়। নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত দায়িত্ববোধ ছাড়া গুজব প্রতিরোধ টেকসই হবে না।
গুজব শেষ পর্যন্ত যে ক্ষতিটি সবচেয়ে বেশি করে, তা হলো বিশ্বাসের ক্ষয়। যখন মানুষ বারবার ভুয়া তথ্যের মুখোমুখি হয়, তখন সত্যও সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এই বিশ্বাসহীনতা গণতন্ত্র, সামাজিক ঐক্য ও উন্নয়নের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই ফ্যাক্ট চেকিং কেবল তথ্য যাচাই নয়; এটি বিশ্বাস পুনর্গঠনের একটি প্রক্রিয়া।
ডিজিটাল যুগে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা বদলে গেছে। এখন নাগরিক মানে শুধু রাষ্ট্রের আইন মানা নয়, অনলাইন পরিসরেও দায়িত্বশীল আচরণ করা। একজন সচেতন ডিজিটাল সিটিজেন জানেন যাচাই ছাড়া শেয়ার করা মানেই গুজবের অংশ হয়ে যাওয়া। আর একজন দায়িত্বশীল নাগরিক জানেন, সত্য যাচাই করা কেবল অধিকার নয়, দায়িত্বও।
প্রযুক্তির যুগে সত্যকে রক্ষা করতে হলে আমাদের হাতেই দায়িত্ব নিতে হবে। শেয়ার করার আগে এক মিনিট থামা, যাচাই করা ও ভাবা, এই ছোট অভ্যাসই পারে বড় সামাজিক বিপর্যয় ঠেকাতে। দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক ও সক্রিয় ফ্যাক্ট চেকিং চর্চাই পারে গুজবমুক্ত, নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল সমাজ গড়ে তুলতে। গুজব প্রতিরোধে প্রযুক্তির পাশাপাশি আমাদের সচেতন আচরণই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।[email protected]
এইচআর/এমএস
Read the full article
Continue reading on jagonews24.com
More from jagonews24.com

13 minutes ago
Бизнес недели. Зарядить электрокар стало дороже, Киевстар приобрел новый актив, а инвестиции в defence tech выросли в 100 раз

14 minutes ago
টাঙ্গাইলে ট্রাক-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২

14 minutes ago
В Хакасии загорелся гостевой дом, несколько человек погибли
14 minutes ago