সাভারের ট্যানারি বর্জ্য কেড়ে নিচ্ছে ধলেশ্বরীর প্রাণ
jagonews24.com
Saturday, January 31, 2026
ঢাকার প্রাণখ্যাত বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে সাভারে নেওয়া হয়। কিন্তু বুড়িগঙ্গা রক্ষা পায়নি। উল্টো ধলেশ্বরী নদীও দূষিত হয়েছে। প্রায় ৯ বছর হতে চললেও শিল্পনগরীর সিইটিপি পুরো কার্যকর হয়নি। এলডব্লিউজি সনদ না পাওয়ায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে নেতিব...
ঢাকার প্রাণখ্যাত বুড়িগঙ্গা নদী দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে সাভারে নেওয়া হয়। কিন্তু বুড়িগঙ্গা রক্ষা পায়নি। উল্টো ধলেশ্বরী নদীও দূষিত হয়েছে। প্রায় ৯ বছর হতে চললেও শিল্পনগরীর সিইটিপি পুরো কার্যকর হয়নি। এলডব্লিউজি সনদ না পাওয়ায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চামড়া শিল্প নিয়ে জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এমদাদুল হক তুহিনের তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ।
‘নদীর পাড়ে ময়লা। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছোট ছোট চামড়া। মানুষ নদীতে নামতে পারে না। নদীর মাছও খাওয়া যায় না। ছোটবেলায় এই নদীতে গোসল করতাম। অথচ এখন কেউ নদীতে নামেও না। নামবে তো দূরের কথা, নদীর পাড়েও আসে না!’
সম্প্রতি পড়ন্ত এক বিকেলে রাজধানীর অদূরে সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে (ট্যানারি) ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো জাগো নিউজকে বলছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম।
ট্যানারির ৩ নম্বর গেট এলাকার ঝাউচরের এই বাসিন্দার মতোই ট্যানারি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশ কর্মী, ট্যানারি মালিক ও সংশ্লিষ্টদের কণ্ঠে আক্ষেপের সুর।
পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই ট্যানারি পানি, মাটি ও বাতাস- সবই দূষিত করছে। পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় কমছে মাছ। এই দূষণ প্রভাব ফেলছে প্রাণ-প্রকৃতিতে। নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্যও। এই দূষণের কথা অস্বীকার করছে না ট্যানারির দেখভালের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও।

ঢাকার হাজারীবাগের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধ ও চামড়া শিল্পের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ‘বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে প্রায় ২০০ একর জমিতে এই ট্যানারি গড়ে তোলা হয়। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করে সাভারে নেওয়া হয়। আর ২০২১ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ১৬২টি ট্যানারিকে সেখানে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরিবেশ দূষণকারী শিল্প। বিষয়টি মাথায় রেখে সাভারের ট্যানারিতে ১৭ একর জমিতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপন করা হয়। এটি করা হয় ধলেশ্বরী নদীর তীর ঘেষেই। তবে এই সিইটিপি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। প্রকল্পের কাজ পাওয়া চীনা প্রতিষ্ঠান নকশা অনুযায়ী কাজ করেনি এমন অভিযোগ বহু বছরের পুরোনো। পরিকল্পনা অনুযায়ী সিইটিপির যে সক্ষমতা থাকার কথা, আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাই বাস্তবে সেই সক্ষমতা পায়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত এই সিইটিপি তরল ও কঠিন বর্জ্য শোধনে পরিবেশের সব মানদণ্ড মানার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। শতভাগ সক্ষমতা অর্জন করতে না পারা সিইটিপিকেই সাভার শিল্পনগরীর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবেও দেখা হয়। এর তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কও বহুদিনের।
তথ্যমতে, সাভার শিল্পনগরীতে বর্তমানে সচল ট্যানারির সংখ্যা ১৪৭ থেকে ১৪৮টি। ট্যানারির সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর নয়। বেশ কিছু সূচকে এখনো পরিবেশের মানদণ্ড মানার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি এই সিইটিপি। ছয়টি ট্যানারিকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত ইটিপি করেছে মাত্র দুটি। আর সাভারে বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাওয়া ট্যানারি মাত্র একটি। দেশে এই সনদ পাওয়া ট্যানারির সংখ্যা আটটি। কঠিন বর্জ্য কমাতে কাঁচা চামড়ার কাটিং রপ্তানিতে সাত প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এলডব্লিউজি সনদ না পাওয়ায় দেশের চামড়া ও চামড়াপণ্যের রপ্তানি বাড়ছে না।

সরেজমিনে যা দেখা গেলো
সাভারে চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপির পাশে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে ওপেন ডাম্পিং ইয়ার্ড। সেখানে সিইটিপি থেকে পরিশোধিত কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়। আবার ট্যানারিগুলো থেকেও ট্রাকে করে কঠিন বর্জ্য আসে এখানে। কিন্তু সেই ডাম্পিং ইয়ার্ডগুলোই রয়েছে উন্মুক্ত। শুধু যে উন্মুক্ত তাই নয়, নদীর ধারে দুটি পুকুরাকৃতির ডাম্পিং ইয়ার্ডে নেই কোনো দেওয়াল। ফলে এখানকার বর্জ্যগুলো বৃষ্টির দিনে সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে। কেবল তাই নয়, শুষ্ক মৌসুমেও এই বর্জ্যগুলোর সঙ্গে থাকা পানি নদীতে পড়তে দেখা গেছে। সেই উন্মুক্ত স্থানেই পোড়ানো হচ্ছে চামড়া বর্জ্য। এতে বাতাসেও ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। আর উন্মুক্ত ডাম্পিং ইয়ার্ডের কারণে পরিবেশ ও নদী দূষণের কথা অস্বীকার করছে না খোদ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনও (বিসিক)!
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিকের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রকল্পে না থাকায় এখানে কোনো দেওয়াল দেওয়া হয়নি। বসানো হয়নি শেডও। এটি প্রকল্পের ব্যর্থতা।’
আরও পড়ুন
সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বেপজার কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা
ট্যানারি শিল্প বেপজার অধীনে নেওয়া নিয়ে মালিক-শ্রমিকদের উদ্বেগ
পোশাক-চামড়া রপ্তানিতে বাংলাদেশকে অংশীদার হিসেবে চায় মঙ্গোলিয়া
মাত্র ২ বছরেই চামড়া শিল্পে বাজিমাত উদ্যোক্তা তাহমিনার
বিসিকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দেওয়াল না থাকায় পরিবেশের কিছু ক্ষতি হচ্ছে—এটা আমরা মানি। প্রয়োজনে বৃষ্টির পানি বা বন্যার সময় লিকেজ ঠেকাতে দেওয়াল বা আবদ্ধ ব্যবস্থার কথাও আমরা ভাবছি।’
এদিকে, সিইটিপি থেকে যে পাইপে নদীতে পানি পড়ছে সেটি পর্যবেক্ষণ করেছে জাগো নিউজ। নদীর তীরে নেমে দেখা গেছে, পাইপের একটি অংশে ফাটল সৃষ্টি হওয়ায় চুইয়ে চুইয়ে সেখানকার মাটিতেও কিছু পানি পড়ছে। যে জায়গায় চুয়ে চুয়ে পানি পড়ছে, সেখানকার মাটি কালচে রং ধারণ করেছে। ট্যানারির বর্জ্য ও পানিতে মাটিও যে দূষিত হচ্ছে, মাটির ওই চিত্রও তা জানান দিচ্ছিল।

ট্যানারি পল্লিতেও দেখা গেছে, একটি উন্মুক্ত ড্রেনে কালো পানি। ট্যানারি থেকে আসা সেই পানিও পরিশোধিত না হয়ে সরাসরি নদীতে পড়ছে। এছাড়া ট্যানারির ভেতরকার পরিবেশও খুব বেশি পরিষ্কার ও পরিবেশসম্মত নয়।
জানতে চাইলে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্যানারির কারণে পরিবেশের কিছু না কিছু ক্ষতি হচ্ছে বলে আমরাও বিশ্বাস করি। ট্যানারির সিইটিপিও পুরোপুরি কার্যকর নয়। আর ডাম্পিং ইয়ার্ড থেকে ওয়েস্টেজ যাতে বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে কিংবা অন্যভাবে নদীতে না যায়- সেজন্য সেখানে দেওয়াল করার চিন্তা করবো। এই ট্যানারিতে সলিড ওয়েস্ট ও সিইটিপি ব্যবস্থাপনা আরও ভালো হতে পারতো।’
পরিবেশের মানদণ্ড অনুযায়ী সিইটিপির বর্তমান চিত্র
সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) বা কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার শিল্পনগরীর তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে। এরমধ্যে ট্যানারি থেকে নির্গত ক্রোমযুক্ত পানি ও সাধারণ পানি সিইটিপিতে এসে শোধন প্রক্রিয়া শেষে নদীতে নির্গত হয়। কঠিন বর্জ্যগুলো উন্মুক্ত স্থানে গড়ে তোলা ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ডাম্পিং স্টেশনে রাখা হয়। যেখান থেকে কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়েও পড়ে। বিভিন্ন সময়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সর্বশেষ তথ্যমতে, গত আগস্টের পরিবেশের রিপোর্ট অনুযায়ী ক্রোম, পিএইচ এবং ওয়েল অ্যান্ড গ্রিজ পরিবেশের মানদণ্ডের মধ্যে ছিল। তবে পানির গুণমান বা দূষণের মাত্রা পরিমাপের দুটি প্রধান নির্দেশক টোটাল সাসপেন্ডেড সলিডস (টিএসএস) এবং বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) পরিবেশের মানদণ্ড থেকে বেশি ছিল। গত আগস্টে ক্রোমিয়াম লেভেল ছিল ১ দশমিক ৪৫, মানদণ্ড অনুযায়ী সেটি থাকার কথা ২। বর্তমানে ক্রোমিয়াম লেভেল ভালো পর্যায়ে। ওয়েল অ্যান্ড গ্রিজের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬। স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী এটি ১০-এর ওপরে থাকলে ক্ষতিকর। অর্থাৎ এই সূচকটিও ট্যানারির সিইটিপির অবস্থান ভালো রয়েছে। গত আগস্টে পিএইচের মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৪৫। এটি ৭ থেকে ৯-এর মধ্যে থাকার কথা। এই সূচকেও ভালো অবস্থানে রয়েছে ট্যানারির সিইটিপি।

তবে বিওডি, টিএসএস ও ক্লোরাইড- এই তিনটি সূচক পরিবেশের মানদণ্ডের মধ্যে নেই। গত আগস্টে বিওডির মাত্রা পাওয়া গেছে ৩০৮। এর আদর্শিক মানমাত্রা মাত্র ৩০। এই সূচকে খুবই খারাপ অবস্থানে রয়েছে সিইটিপি। একইভাবে যেখানে টিএসএসের আদর্শিক মান ১০০, সেখানে গত আগস্টে ছিল ১৬২। এই সূচকেও ভালো অবস্থানে নেই ট্যানারি। একইভাবে ক্লোরাইডের মাত্রা ২ হাজার থাকার কথা থাকলেও সেখানে গত আগস্টে তা ছিল ৪ হাজার ১০০। এই সূচকেও বেশ খারাপ অবস্থানে সিইটিপি।
এ বিষয়ে সিইটিপির দায়িত্বে থাকা ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. গোলাম শাহনেওয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্যানারিগুলো যদি সঠিকভাবে প্রিট্রিটমেন্ট, ক্রোম রিকোভারি ও হাইকোর্টের চারটি রুলস সঠিকভাবে মেনে চলে তাহলে বিওডি, টিডিএস ও টিএসএসের মানের অগ্রগতি হবে। একইসঙ্গে অর্থপ্রাপ্তির সাপেক্ষে সিইটিপির অচল মেশিনগুলো রেক্টিফিকেশন ও আপগ্রেডেশন করতে পারলে সব সূচক পরিবেশের মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় চলে আসবে।’
আরও পড়ুন
চামড়ায় দেওয়া লবণে বিট লবণ তৈরি
আগামী বছর চামড়া সংরক্ষণের আগ্রহ আরও বাড়বে: বাণিজ্য উপদেষ্টা
চামড়া শিল্পের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি: প্রধান উপদেষ্টা
চামড়া শিল্পের উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ
নদীর পানি কালচে হয়ে গেছে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সিইটিপির এমডি বলেন, ‘নদীর পানির রং কালো নয়। তবে এটি একদম স্বচ্ছও নয়। সিইটিপি থেকে যে পানি যায় সেটি একটু রেডিশ টাইপের থাকে। হালকা রেডিশ। কারণ আমাদের সিইটিপিতে বায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট হয়; যেখানে বিভিন্ন মাইক্রোঅর্গানিজম অ্যামিবা, ফাঙ্গাস ও ব্যাকটেরিয়া- এই স্ল্যাসগুলো খেয়ে ফেলে। ফাইনাল ট্রিটমেন্টটা ওভাবে হয়। আপনি যদি পিউর স্বচ্ছ ওয়াটার চান সেজন্য টারশিয়ারি ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু চীনারা যখন এটি করে গেছে, সে ট্রিটমেন্টটি তারা এখানে মিসিং রেখে গেছে। এটি তারা ইনক্লুড করেনি। বর্তমানে আমরা টারশিয়ারি ট্রিটমেন্টের কথাও উল্লেখ করেছি। পানির রং স্বচ্ছ করতে অনেক ধরনের টেকনোলজি রয়েছে। কিন্তু এখানে সেগুলো মিসিং রয়েছে। ইটাল প্রগতির এক্সপার্টদের মাধ্যমেও এই প্রযুক্তির কথাগুলো হয়তো আসবে। যদি আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় তাহলে সেই পানিটা আমরা রিসাইকেলও করতে পারবো। নদীতে না ফেলে সেটি পুনঃব্যবহার করতে পারবো।’
এ বিষয়ে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাভার চামড়ানগরীতে বর্তমানে যে সলিড ওয়েস্ট রয়েছে, তার বড় একটি অংশ দীর্ঘ ৮–১২ বছর ধরে জমে থাকা পুরোনো বর্জ্য। আগে যেভাবে ডিসপোজাল ব্যবস্থা ছিল, সেটি বৈজ্ঞানিক ছিল না বলেই এই জমাট তৈরি হয়েছে। এখন আমরা বিভিন্ন উপায়ে এই সলিড ওয়েস্ট ডিসপোজালের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে ক্রোম শেভিং ডাস্ট চীনের একটি প্রসেসিং সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে এবং র-ট্রিমিং, মাথা ও অন্যান্য বর্জ্যের একটি অংশ রপ্তানি করা হচ্ছে। ফলে নতুন করে সলিড ওয়েস্ট জমার পরিমাণ অনেক কমে এসেছে।’
বিসিক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে চামড়ানগরী থেকে বিপুল পরিমাণ ক্রোমযুক্ত পানি সরাসরি নদীতে যাচ্ছে—বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়। ক্রোম ব্যবহার হয় ওয়েট স্টেজ ও ক্রাস্টিং স্টেজে। তার আগে যে লালচে পানি বের হয়, সেটি ক্রোমযুক্ত নয়। বর্তমানে ট্যানারিগুলোর ক্রোমযুক্ত বর্জ্য সিইটিপিতে ট্রিটমেন্টের পরই ডিসচার্জ করা হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ ক্রোমযুক্ত পানি বাইরে ফেললে সেটি অবশ্যই অপরাধ।’

যা বলছেন সাভারের স্থানীয় ও পরিবেশ কর্মীরা
সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাভার ট্যানারির ডাম্পিং স্টেশন উন্মুক্ত স্থানে। সেখান থেকে বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে। ট্যানারির সিইটিপি কাজ করে না। এটি পরিবেশ ও নদীদূষণ করছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ প্রকল্পে ভুল করা হয়েছে।’
শামসুল হক বলেন, ‘নদী দখল করে ট্যানারি করেছে। এই ট্যানারি সাভারের সমস্ত সেক্টরকেই ক্ষতি করছে। এই প্রকল্পের সব কিছুই ভুল। ওপেন ডাম্পিং স্টেশন, ইটিপির কিছুই হয়নি। মাছ তো দূরের কথা, পানিই তো নষ্ট হয়ে গেছে। পানিতে তো হাতই দেওয়া যায় না। বাতাস দূষিত হয়ে গেছে। সাভারকে ডি গ্রেডের এয়ারশেড ঘোষণা করা হয়েছে। পানি নষ্ট, মাটি নষ্ট, বাতাস নষ্ট-এখানে কেউ কিছু মানে না!’
আরও পড়ুন
চামড়া শিল্পের অগ্রগতিতে অন্তরায় ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড’
সরবরাহ কমায় চামড়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনিশ্চয়তা
কোরবানির চামড়া সংগ্রহে তথ্য বিভ্রাট, নষ্ট ‘হাজার হাজার’
সরকার-পাইকারের মাঝে পড়ে চিড়েচ্যাপ্টা চামড়া ব্যবসায়ীরা
সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহ্ উদ্দিন খান (নঈম) জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্যানারিতে কাঁচা চামড়া লবণ দিয়ে প্রসেস করে রাখে। এখানে ভেতরে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের লবণের পানি নদীতে যাচ্ছে। ধলেশ্বরীতে যাচ্ছে, এটি তুরাগ হয়ে আবার বুড়িগঙ্গায় যাচ্ছে। বিভিন্ন রাসায়নিক, চামড়ার লোম, প্রলেপগুলো- সম্পূর্ণরূপে কৃষিজমিতে ও নদীতে যাওয়ার কারণে লবণাক্ত হচ্ছে। কেমিক্যালের কারণে মাছ মরে যাচ্ছে, পানি দূষিত হচ্ছে। কৃষিজমিতে উৎপাদন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখানে গবাদি পশুপালন করতেও সংকট দেখা দিয়েছে।’
‘নিয়ম হচ্ছে তাদের ফ্যাক্টরিতে এগুলো প্রসেস করবে। এই পানি সিটিইপিতে পাঠাবে এবং সেখান থেকে প্রসেস হয়ে নদীতে পড়বে। কিন্তু সিইটিপি সচল না থাকায়, ম্যানুয়াল করায়, ট্যানারির কারণে আমাদের এখানে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে।’ বলছিলেন সালাহ্ উদ্দিন খান।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাজারীবাগে ট্যানারি থাকার সময়েই বুড়িগঙ্গা নদী প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন কোনো কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা ছিল না। কেমিক্যাল ও বিষাক্ত পানি সরাসরি নদীতে ফেলা হতো। ফলে মাছ, জীববৈচিত্র্য ও নদীর স্বাভাবিক জীবন ধ্বংস হয়ে যায়। আন্দোলনের মাধ্যমে ট্যানারি সরিয়ে সাভারে নেওয়া হলেও সেখানে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কেন্দ্রীয় সিইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। এটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। ড্রেনেজ ও ডাম্পিং ব্যবস্থা পরিবেশসম্মত নয়। সাভারের ট্যানারি থেকে দূষিত পানি ও বর্জ্য গিয়ে ধলেশ্বরীসহ আশপাশের নদীগুলোকে আবারও ধ্বংস করছে। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, বর্জ্য মাটির নিচ দিয়ে নদীতে মিশে যাচ্ছে। এতে মাছ, জলজ প্রাণী ও প্রকৃতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।’
বাপার এই নেতা শিল্প মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দিকে তীর ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘শিল্প মন্ত্রণালয়কে বারবার এসব বিষয় জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবহেলা, অনাগ্রহ ও দুর্নীতির কারণেই পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স মানা হচ্ছে না।’
মাছ ও পানি দূষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নদীর পানিতে যখন ক্রোমিয়ামসহ ট্যানারির বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশে যায়, তখন সেখানে মাছ বেঁচে থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। পানির স্বাভাবিক গুণগত মান নষ্ট হয়ে গেলে মাছ ধ্বংস হবেই। আর খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে, যা বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। ফলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।’
স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মো. আলমগীর কবির বলেন, ‘ট্যানারি এলাকাগুলোতে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। হাজারীবাগে যেমন ছিল, এখন সাভার এলাকায়ও একই ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে ট্যানারি শিল্প নদী, পরিবেশ ও মানুষের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশপাশের মানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে সেখানে থাকলেও তারা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।’

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মী রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ট্যানারি শিল্প পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছিল বলেই একে জনবহুল এলাকা থেকে সরানো হয়েছে। কিন্তু সরানোর পরেও যদি নদীর সঙ্গে সরাসরি বর্জ্য নিঃসরণ করা হয়, তাহলে পরিমাপ না করেও বলা যায়—এটা পরিবেশ দূষণ করছে, আর সেটা কোনো আইনেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
কারা দায়ী এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আইন বা নীতির অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গায় আমরা ভীষণ দুর্বল। পরিবেশ অধিদপ্তরের এখানেই বড় দায়িত্ব আছে। তারা চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারে, কিন্তু শাস্তিমূলক বিধান থাকা সত্ত্বেও তা প্রয়োগ করা হয় না।’
‘কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি আছে। একেকটি দপ্তর আরেকটির কাজ বা দায়িত্ব সম্পর্কে ঠিকমতো খোঁজই রাখে না—এটাই বড় দুর্বলতা।’–যোগ করেন রাশেদা কে চৌধুরী।
নদী ও পরিবেশ দূষণ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সিইটিপির যে ক্যাপাসিটি আছে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় কম। এই ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে। কারা এই হিসাব করলো, কেন এমন হলো? অনেকে রাতের বেলায় নদীতে বর্জ্য ফেলছে এবং এগুলো কিন্তু আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা জানে। তারা এগুলো সব সময় আমাদের মূল বাজারগুলোতে প্রচার করছে। এসব কারণেও রপ্তানিতে প্রভাব পড়ছে। আর আমাদের নদীতে বিভিন্নভাবে বর্জ্য যাচ্ছে এবং নদী ধ্বংস হচ্ছে। পরিবেশ অবান্ধবভাবে হচ্ছে। সেখানে অবশ্যই এই সিইটিপিকে কীভাবে আরও পরিবেশবান্ধব করা যায় জরুরিভাবে সেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করি।’

যা বলছেন ট্যানারির মালিক ও নেতারা
নদী ও পরিবেশ দূষণের বিষয়টি পুরোপুরি স্বীকার করছেন না ট্যানারির মালিকরা। তবে সিইটিপি পুরো কার্যকর না থাকার কারণেই পরিবেশ দূষণ হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাজারীবাগে তো আমাদের কোনো ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টই ছিলো না। সাভার শিল্পনগরীতে লিকুইড ট্রিটমেন্ট হচ্ছে, কিন্তু সেটি পরিবেশসম্মত হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড ৮৫ শতাংশ পরিবেশসম্মত হচ্ছে। ১৫ শতাংশ এখনো মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। সলিড ওয়েস্ট এখন একেবারে জিরো। সলিড ওয়েস্ট ওপেন ডাম্পিং করছে। চীনা একটি কোম্পানি ফ্যাক্টরি করেছে, র-হাইটসের কাটিং নিয়ে যাচ্ছে, তারা সেটি ব্যবহার করছে। এটি আমাদের জন্য পজিটিভ দিক। সলিড ওয়েস্টের জন্য যদি আরও দু-একটি ফ্যাক্টরি হয়, তাহলে মোটামুটি একটি সমাধান হয়ে যাবে।’
এক প্রশ্নের উত্তর শাহীন আহমেদ বলেন, ‘সিইটিপির ক্ষেত্রে আমাদের কোনো দায় নেই। এটি বিসিক করেছে। আমরা ট্রিটমেন্টের খরচ দিচ্ছি। এটিকে প্রপার ট্রিটমেন্ট করা না করা বিসিকের দায়িত্ব। সিইটিপিতে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্রিটমেন্ট হচ্ছে।’
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিইটিপি কার্যকর, কিন্তু এর প্যারামিটারগুলোর মধ্যে দু-একটি পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় নেই। ক্লোরাইড, বিওডি ও ক্রোমের প্যারামিটার ঠিক নেই। অন্য প্যারামিটারগুলো পরিবেশের মানদণ্ড অনুযায়ী রয়েছে। ট্যানারি পানিগুলো ট্রিটমেন্ট হয়েই নদীতে যাচ্ছে। ট্রিটমেন্ট ছাড়া কোনো পানি নদীতে যায় না। ফ্লেশিংয়ের স্ল্যাসগুলোও নদীর পাড়ে এখন আর রাখা হয় না। এগুলো এখন ডাম্পিংয়ে রাখা হয়। যেগুলো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, সেগুলো নদীর পাড়ে রাখা হয় না। আগের মতো খোলামেলা স্থানে রাখা হয় না।’
আগামীকাল পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব: সাভার ট্যানারিতে পুরো কার্যকর নয় সিইটিপি, নিজস্ব ইটিপিতেও আগ্রহ কম
ইএইচটি/এমএমএআর/এমএফএ
Read the full article
Continue reading on jagonews24.com
More from jagonews24.com

15 minutes ago
جمالینژاد: کالابرگ برای حفظ امنیت غذایی خانوارها بازنگری میشود

15 minutes ago
ببینید | سقوط مرگبار خودروی سواری به دره در بزرگراه خرازی

15 minutes ago
«دو نیمه ماه»؛ روایتی متفاوت و غیرشعاری از تاریخ انقلاب اسلامی
16 minutes ago