রাজস্ব সক্ষমতা জোরদারে সমন্বিত ও কাঠামোগত কর সংস্কার জরুরি
jagonews24.com
Thursday, January 29, 2026
দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন চাহিদা পূরণে খণ্ডিত বা কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগভিত্তিক সংস্কারের পরিবর্তে সমন্বিত ও কাঠামোগত কর সংস্কার জরুরি। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। ...
দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এবং ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন চাহিদা পূরণে খণ্ডিত বা কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগভিত্তিক সংস্কারের পরিবর্তে সমন্বিত ও কাঠামোগত কর সংস্কার জরুরি।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। ‘উন্নয়নের জন্য করনীতি: করব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের জন্য সংস্কার এজেন্ডা’ শীর্ষক প্রতিবেদনের ওপর এ সংবাদ সম্মেলন হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের বিদ্যমান করব্যবস্থা অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল ও অদক্ষ। করের আওতা সংকীর্ণ, কর প্রশাসন অত্যধিক কাগজ-কলম নির্ভর এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিদ্যমান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সুসংহত ও সুশৃঙ্খল করনীতির ভিত্তি ছাড়া কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। প্রান্তিক পর্যায়ের সংস্কার দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা যাবে না।
সরাসরি কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও বাণিজ্য কর- এই তিনটি প্রধান খাতে মোট ৫৫টি অগ্রাধিকারের নীতিগত বিষয় প্রতিবেদনটি চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সরাসরি কর খাতে ৩২টি, ভ্যাটে ১০টি ও বাণিজ্য কর খাতে ১৩টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেদনে ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০-১২ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর কাঠামোয় ভারসাম্য
পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি করের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানের ৭০:৩০ অনুপাত ধাপে ধাপে ৫০:৫০-এ উন্নীত করা হবে। সরাসরি কর থেকে রাজস্ব আদায় জিডিপির প্রায় আড়াই শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯-১০ শতাংশে উন্নীত হবে। মোট রাজস্ব আয়ে বাণিজ্য করের অংশ বর্তমানের প্রায় ২৮ শতাংশ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত শতাংশে নামানো হবে। কর-জিডিপি অনুপাত ১৫-২০ শতাংশে উন্নীত হলে এই হ্রাসকৃত হারেও বাণিজ্য কর থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে।
প্রশাসন ও নীতি সংক্রান্ত সতর্কতা
দুর্বল করনীতি প্রশাসনকে নিয়মের বদলে বিবেচনানির্ভর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এর ফলে আগ্রাসী নিরীক্ষা, ইচ্ছামতো মূল্যায়ন ও উৎসে কর কর্তনের মতো চর্চা গড়ে ওঠে, যা করব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বেচ্ছাকৃত করমুক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল রূপান্তর
প্রতিবেদনে ডিজিটাল রূপান্তর, স্বয়ংক্রিয়ীকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষাকে মূল স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাণিজ্য কর সংস্কার
প্রতিবেদন ধাপে ধাপে ট্যারিফ ও প্যারা ট্যারিফের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভ্যাট, ব্যক্তিগত আয়কর, করপোরেট আয়কর ও সম্পত্তি করের দিকে ঝুঁকে পড়ার সুপারিশ করেছে।
বর্তমান শুল্ক কাঠামো অতিমাত্রায় জটিল, বাণিজ্য ও আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং রপ্তানিবিমুখ পক্ষপাত তৈরি করছে। শুল্ক কাঠামোর আধুনিকীকরণ ও যৌক্তিকীকরণ, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট ব্যবহার বন্ধ এবং দেশীয় বিক্রি যেন রপ্তানির তুলনায় বেশি লাভজনক না হয়- এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের মূল্যায়ন সমস্যাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধান করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে ইউএনসিটিএডি-সমর্থিত এএসওয়াইসিইউডিএ ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলেও যথাযথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। বন্দরে বিবেচনানির্ভর মূল্যায়নের পরিবর্তে এএসওয়াইসিইউডিএ-এর অন্তর্নির্মিত ঝুঁকি সংকেত ও মূল্য তথ্য ব্যবহার করে পোস্ট-ক্লিয়ারেন্স অডিটের মাধ্যমে মূল্যায়ন কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ভ্যাট সংস্কার
প্রতিবেদনটি ভ্যাট-ব্যবস্থাকে বিস্তৃত ও দক্ষ ভোগকর-ব্যবস্থায় রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ধাপে ধাপে একক ভ্যাট হার প্রবর্তনের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর অব্যাহতি প্রত্যাহার এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব জিডিপির তুলনায় কম, যেখানে কর অব্যাহতির কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। ডিজিটাল সংযুক্তি, ই-ইনভয়েসিং এবং সহজতর করব্যবস্থার মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধাপে ধাপে ভ্যাটের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সরাসরি কর সংস্কার
সরাসরি কর খাতে ব্যক্তিগত আয়করের আওতা সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা উচ্চ করহার নয়, বরং সংকীর্ণ করভিত্তি। কর পরিপালন উৎসাহিত করতে সর্বোচ্চ মার্জিনাল করহার ২৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
করপোরেট আয়কর সংস্কারের অংশ হিসেবে ইকুইটির ৩৫ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অভিন্ন ১৫ শতাংশ করহার প্রযোজ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে এবং পুঁজিবাজারের ভূমিকা জোরদার হয়। উৎসে করব্যবস্থায়ও মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবিত- বেতন, সুদ, লভ্যাংশ ও তালিকাভুক্ত শেয়ারের মূলধনী লাভ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে উৎসে কর ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে মোট আয়ের ওপর ন্যূনতম করব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সম্পত্তি কর ও উত্তরাধিকার কর
সম্পত্তি হস্তান্তর ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কর কাঠামো আধুনিকীকরণের মাধ্যমে করভিত্তি সম্প্রসারণ ও সম্পত্তি বাজারের আনুষ্ঠানিকীকরণ সম্ভব হবে।
আইএইচও/একিউএফ
Read the full article
Continue reading on jagonews24.com


