বিলাসিতা বনাম বাস্তবতা
jagonews24.com
Thursday, January 29, 2026

বাঙালি কী পারে? এই কালজয়ী প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কোনো সমাজবিজ্ঞানীর দরকার নেই, কেবল বাঙালির ফেসবুক ওয়াল আর চায়ের দোকানের আড্ডাই যথেষ্ট। বাঙালি সব পারে। সে নিজের পকেটে ১০ টাকার নোট না থাকলেও বিশ্বব্যাংকের ঋণের শর্ত নিয়ে তিন ঘণ্টা বিতর্ক করতে পারে। সে নিজের বাড়ির উঠানে নর্দমার জল জমিয়ে রেখে পাশ...
বাঙালি কী পারে? এই কালজয়ী প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কোনো সমাজবিজ্ঞানীর দরকার নেই, কেবল বাঙালির ফেসবুক ওয়াল আর চায়ের দোকানের আড্ডাই যথেষ্ট। বাঙালি সব পারে। সে নিজের পকেটে ১০ টাকার নোট না থাকলেও বিশ্বব্যাংকের ঋণের শর্ত নিয়ে তিন ঘণ্টা বিতর্ক করতে পারে। সে নিজের বাড়ির উঠানে নর্দমার জল জমিয়ে রেখে পাশের বাড়ির বারান্দার টবে কেন মশা উড়ছে, তা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা পর্যন্ত দৌড়াতে পারে। বাঙালি পারে বদনাম করতে, পারে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে, ‘এই দেশ আর ঠিক হলো না।’
বাঙালি পারে সকালবেলা পত্রিকার শিরোনাম দেখে দুপুরের ভাত হজম না হওয়া পর্যন্ত গালাগালি করতে। কিন্তু বাঙালি একটা কাজ একদমই পারে না—কারও আরাম সহ্য করতে। বাঙালির সবচেয়ে বড় সক্ষমতা হলো অন্যের আরাম দেখে নিজের রক্তচাপ বাড়িয়ে ফেলা। বিশেষ করে সেই আরাম যদি হয় রাষ্ট্রের ‘সেবক’দের, তাহলে তো কথাই নেই—বাঙালির নৈতিকতা তখন এভারেস্টের চূড়ায় গিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে গর্জন শুরু করে।
যারা দেশ চালায়, রাষ্ট্র চালায়—তাদের জন্য যদি একটু আলিশান বাড়ি, একটু বড় ফ্ল্যাট, একটু ফাঁকা জায়গা রাখা হয়, তাতেই বাঙালির গায়ে জ্বালা ধরে যায়। যেন ওই ফ্ল্যাটের প্রতিটা বর্গফুট তার নিজের পেট থেকে কেটে নেওয়া। অথচ কেউ একবারও ভেবে দেখে না—দেশ চালানো কি এত সস্তা কাজ? দিনের পর দিন ক্ষমতার ভার বহন করতে করতে মানুষের কোমর ভেঙে যায়, মাথা ভারী হয়ে আসে। সেই মানুষগুলোর একটু প্রশস্ত ঘরে হাঁটার অধিকার নেই?
সম্প্রতি গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সরকার নাকি ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় তিনটি নতুন ভবন বানাবে। শুনেই শুরু হয়ে গেছে আর্তনাদ। মোট ৭২টি ফ্ল্যাট, প্রতিটির আয়তন ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। ব্যয়? মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। ‘মাত্র’ শব্দটা শুনে কেউ কেউ চমকে উঠবেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্কেলে এই ‘মাত্র’ শব্দটাই স্বাভাবিক। কারণ রাষ্ট্র কোনো মুদির দোকান না, যে খুচরা হিসাব মিলিয়ে চলবে। রাষ্ট্র মানে ব্যাপ্তি, রাষ্ট্র মানে প্রশস্ততা, রাষ্ট্র মানে বড় করে ভাবা।
বেইলি রোড, মিন্টো রোড আর হেয়ার রোড—এই তিন রাস্তার নাম শুনলেই একটা গাম্ভীর্য নেমে আসে। এটা সাধারণ রাস্তা নয়, এটা মন্ত্রিপাড়া। এখানে ফুটপাতও যেন একটু গম্ভীর, বাতাসেও একটা সরকারি গন্ধ। এই এলাকায় নতুন ভবন মানে শুধু ইট-সিমেন্ট নয়, এটা আসলে ক্ষমতার নতুন আসবাবপত্র। এখানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সাংবিধানিক সংস্থার প্রধান—সবাই থাকবেন। মানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে এক জায়গায় সাজিয়ে রাখা হবে।
সমস্যা হলো, কিছু নিন্দুক হিসাব কষে ফেলেছে। হিসাবটা হলো, মন্ত্রিপাড়ায় আগে থেকেই ১৫টা বাংলো আছে। বেইলি রোডে আবার মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট নামে তিনটি ভবন আছে, যেখানে ৩০টি ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাট সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গফুট (সাইজে তা মোটেও ছোট না)। তার ওপর গুলশান, ধানমন্ডিতেও রয়েছে আলাদা আবাসন। সব মিলিয়ে ঢাকায় মন্ত্রীদের জন্য ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাট চিহ্নিত আছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, মন্ত্রীদের আবাসনের সংকট কোথায়?
এই প্রশ্ন তোলাটাই বাঙালির সবচেয়ে বড় অপরাধ। কারণ প্রশ্ন মানেই সন্দেহ, আর সন্দেহ মানেই রাষ্ট্রীয় সৌন্দর্যের ওপর আঘাত। রাষ্ট্র যদি বলে—`আমাদের আরও বড় ফ্ল্যাট দরকার`—তাহলে সেটাকে বিশ্বাস করতে হয়। কারণ রাষ্ট্র কখনো অপ্রয়োজনীয় কিছু চায় না, রাষ্ট্র শুধু প্রয়োজনীয় বিলাসিতা চায়।
নতুন ভবনগুলো হবে ১১ তলা। ছাদে থাকবে সুইমিংপুল। এই জায়গায় এসে বাঙালির মাথা পুরোপুরি গরম। ‘ছাদে সুইমিংপুল’ এই শব্দ দুটো শুনলেই তার চোখে ভেসে ওঠে খালি হাঁড়ি আর পানিশূন্য পুকুর। কিন্তু সে বোঝে না, ছাদে সুইমিংপুল মানে আধুনিক রাষ্ট্র। মন্ত্রীদের মাটি ছুঁয়ে থাকতে নেই, তারা আকাশের কাছাকাছি থাকে, সিদ্ধান্তও নেয় অনেক সময় ভাসমান অবস্থায়।
ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে, খুব যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নাকি অনেক বাংলো ও ফ্ল্যাট খালি ছিল। সেখানে সাংবিধানিক পদের মানুষজন উঠেছেন। যদিও তাদের জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা আছে, তবু তারা মন্ত্রিপাড়ায় থাকছেন। কেন? কারণ সরকার অনুমতি দিয়েছে। এই ‘অনুমতি’ শব্দটার মধ্যেই আসলে সব রহস্য লুকিয়ে আছে। অনুমতি মানে বৈধতা, বৈধতা মানে স্বাচ্ছন্দ্য, স্বাচ্ছন্দ্য মানে বড় ফ্ল্যাট।
কিন্তু আসল গল্পটা আরও ভেতরে। নতুন ফ্ল্যাট বানাতে নাকি সবচেয়ে বেশি আগ্রহ আমলাদের। কারণ মন্ত্রীরা নতুন ভবনে গেলে পুরোনো বড় বড় ফ্ল্যাটগুলো খালি হবে। তখন সেখানে উঠবেন আমলারা। এতে দোষ কী? রাষ্ট্র তো শুধু মন্ত্রী দিয়ে চলে না, রাষ্ট্র চলে ফাইল দিয়ে। আর ফাইল মানেই জায়গা। আজকাল একটা ফাইল রাখতেই তো আলাদা ঘর লাগে, তার ওপর আবার এসি, সোফা, মিটিং স্পেস—এসব কি আকাশ থেকে পড়ে?
এখানে এসে বাঙালি আবার তার চিরাচরিত বাক্যটা ছুড়ে দেয়— ‘এই দেশে চার কোটি মানুষ দুই বেলা খেতে পায় না।’ এই বাক্যটা এতই জনপ্রিয় যে, যে কোনো রাষ্ট্রীয় আরামের খবরের সঙ্গে এটা ফ্রি আসে। কিন্তু কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছে—চার কোটি মানুষ না খেতে পাওয়ার দায় কি মন্ত্রীর ড্রইংরুমের আয়তনের ওপর? মন্ত্রী তো নিজে খেয়ে কাজ করেন। খেয়ে কাজ না করলে দেশ চলবে কীভাবে?
আর ইতিহাস টানতেও বাঙালির জুড়ি নেই। অনেকেই ইতিহাসের পাতা খুঁড়ে বলেন, ব্রিটিশ আমলে সাহেবদের জন্য দু-তিন বিঘা জমিতে বাংলো বানানো হতো। এখনো মানুষ গরিব, অথচ মন্ত্রীরা ৯ হাজার বর্গফুটে থাকবেন—এটা নাকি বেমানান। কিন্তু বাঙালি ভুলে যায়, তখন প্রশ্ন করার স্বাধীনতা ছিল না। এখন আছে বলেই সবাই প্রশ্ন করছে। স্বাধীনতা মানে এই না যে সবকিছুকে ছোট করে দেখতে হবে।
নতুন ভবনগুলো হবে ১১ তলা। ছাদে থাকবে সুইমিংপুল। এই জায়গায় এসে বাঙালির মাথা পুরোপুরি গরম। ‘ছাদে সুইমিংপুল’ এই শব্দ দুটো শুনলেই তার চোখে ভেসে ওঠে খালি হাঁড়ি আর পানিশূন্য পুকুর। কিন্তু সে বোঝে না, ছাদে সুইমিংপুল মানে আধুনিক রাষ্ট্র। মন্ত্রীদের মাটি ছুঁয়ে থাকতে নেই, তারা আকাশের কাছাকাছি থাকে, সিদ্ধান্তও নেয় অনেক সময় ভাসমান অবস্থায়।
সুইমিংপুলের জন্য তিন কোটি টাকা বরাদ্দ। কেউ কেউ বলেছে, রক্ষণাবেক্ষণে খরচ বেশি হবে, দক্ষ লোক লাগবে। এই লোকগুলো আসলে উন্নয়নবিরোধী। তারা বোঝে না, রাষ্ট্রীয় সুইমিংপুল শুধু সাঁতারের জায়গা নয়, এটা মানসিক প্রশান্তির অবকাঠামো। এখানে সাঁতার কাটতে কাটতে সিদ্ধান্ত আসবে, ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে উঠবে নতুন নীতি।
ফ্ল্যাটের একাংশ অফিস হিসেবেও ব্যবহার হবে—এটাই তো স্মার্ট গভর্ন্যান্স। ঘুম থেকে উঠে দুই পা হাঁটলেই রাষ্ট্র, চায়ের কাপের পাশে ফাইল, ডাইনিং টেবিলেই সিদ্ধান্ত। এর চেয়ে দক্ষ প্রশাসন আর কী হতে পারে?
শেষ পর্যন্ত যারা চিৎকার করছে, তাদের উদ্দেশে একটাই কথা—তোরা জাত গরিব। তোরা ভালো কিছু বানাতে পারিস না, ভালো কিছু দেখতেও পারিস না। কারও জন্য একটু সুন্দর হলেই তোদের আঁতে ঘা লাগে। এই রাষ্ট্র তোদের ছোট ঘরের মানসিকতা নিয়ে চলতে পারে না।
এই ৭৮৬ কোটি টাকা আসলে ইট-সিমেন্টে খরচ হচ্ছে না, এটা খরচ হচ্ছে আত্মবিশ্বাসে। কারণ বড় ঘরে থাকলে সিদ্ধান্তও বড় হয়। এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একেবারে প্রাথমিক সূত্র।
যারা সারাদিন সাধারণ মানুষের কথা ভাবে, যাদের সকাল শুরু হয় ফাইল দিয়ে আর রাত শেষ হয় বৈঠক দিয়ে, যাদের নাওয়া–খাওয়ার ঠিক নেই, ছুটি মানে কাগজে লেখা একটা শব্দ—তাদের জন্য যদি একটা ভালো, প্রশস্ত ফ্ল্যাট থাকে, তাতে এমনকি মহাপাপ হয়ে গেলো? তারা তো আর বাঘের দুধের চা খেতে চাইছে না, স্যামন মাছের ডিম দিয়ে অমলেটও বানাতে বলছে না। তারা শুধু একটু আরাম করে শ্বাস নিতে চায়, মাথা গোঁজার জায়গাটা যেন গায়ে না লাগে, হাঁটলে দেওয়ালে ধাক্কা না খায়। এতে কার এত জ্বালা? কার পেটে এত আগুন? আরে বাবা, সামর্থ্য থাকলে তুমিও মন্ত্রী হও—রোদে পুড়ে, গালি খেয়ে, দায়িত্বের বোঝা বইয়ে। তারপর গিয়ে থাকো ওই সুরম্য অট্টালিকায়, ছাদে দাঁড়িয়ে নিচের শহরটা দেখো, তখন বুঝবে—এই আরাম কোনো বিলাসিতা না, এটা দায়িত্ব পালনের ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ মাত্র।
তাই সমালোচনা বন্ধ করুন। বদনাম বন্ধ করুন। রাষ্ট্রকে একটু ছাদে উঠতে দিন। সুইমিংপুলে নামতে দিন।
উন্নয়নের জলে একটু ভেসে থাকুক দেশ। আর আপনি? আপনি নিচে দাঁড়িয়ে দেখুন। তাই দয়া করে সমালোচনা বন্ধ করুন। রাষ্ট্রকে একটু ছাদে উঠতে দিন। সুইমিংপুলে নামতে দিন। উন্নয়নের জলে একটু ভেসে থাকুক দেশ।
আর আপনি? আপনি ওই নিচে কাদাপানিতে দাঁড়িয়ে কেবল তাকিয়ে দেখুন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত কচলাতে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে থাকুন: ‘এই দেশটার আর কিচ্ছু হলো না!’
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক. কলামিস্ট।
এইচআর/এমএস
Read the full article
Continue reading on jagonews24.com
More from jagonews24.com
11 minutes ago
"Тетя Ася приехала" — эту рекламу знала вся страна: что стало с ее героиней
12 minutes ago
Ученые не исключили рост вспышек на Солнце в скором времени
12 minutes ago
APC governors urge transparency ahead of party congresses, convention
13 minutes ago